কবুতর খামারিদের জন্য শীতের মাসিক ছক

কবুতর খামারিদের জন্য শীতের মাসিক ছক

“তাদের অন্তর রয়েছে, তার দ্বারা বিবেচনা করে না, তাদের চোখ রয়েছে, তার দ্বারা দেখে না, আর তাদের কান রয়েছে, তার দ্বারা শোনে না। তারা চতুষ্পদ জন্তুর মত; বরং তাদের চেয়েও নিকৃষ্টতর।“ (সূরা আল আ’রাফঃআয়াত-১৭৯)

আমাদের জীবনে অহরহ অনেক ঘটনা ঘটছে বা অনেক কিছুই আমরা জানতে পারছি পড়া,দেখা বা শুনার মাধ্যমে। যেটা আমাদের মন বিশ্বাস করে না বা সায় দেই না সেগুলোকে আমরা অন্য কারো সাথে আলোচনা করা বা জানানোর প্রয়োজন মনে করি না। কিন্তু যে সব ঘটনা আমরা অন্যের সাথে আলোচনা করি বা জানানোর জন্য ব্যাতিব্যাস্ত থাকি। যদিও বা আমারা মুখে বলে থাকি এগুলো আমি বিশ্বাস করি না বা এগুলো ভুয়া। যেভাবেই বলি না কেন একবার একটু চিন্তা করে দেখেন এগুলোর ব্যাপারে মনের এক কনাই কোথাও যেন এর কিছুটা হলেও বিশ্বাস লুকিয়ে আছে বা এই কথার স্বপক্ষে কোন যুক্তি আপনার মনে আছে। একথার বাস্তবতা বা কেস স্টাডি হল এরূপ, অনেকেই আছেন যারা বলে থাকেন ভাই আমাকে উনি এই ঔষধ দিয়েছেন এটা কি ভাল হবে? বা ভাই আমি উনাকে এই ধরনের ঔষধ দিতে দেখেছি। বা উনাকে এই ঔষধ প্রয়োগ করে উপকার পেতে দেখেছি, আপনি কি বলেন। এভাবে কারো কাছে উপদেশ চাওয়া হয়। বা বলা হয় ভাই উনি আপনার সম্পর্কে এটা বলেন বা বলেছেন। এর মানে আপনি এই কথা স্বপক্ষে আপনার মনে একটু হলেও সমর্থন আছে বা এই কথা আপনি একটু হলেও বিশ্বাস করেন। অনেকেই বলে যা রটে তা কিছু না কিছু বটে। অনেক সময় কিছু না রটলেই আমরা বিশ্বাস করে নেই এটা কিছু বটে। যেমন ভ্যাকসিন এর কোথাই বলি, আমাদের দেশে হাঁস মুরগির ভ্যাকসিন মানুষ দিতেছে অবলীলাই জিজ্ঞাস করলে বলেন, ভাই মানসিক সান্তনা। ভাই অহেতুক মানসিক সান্তনা কেন দিবেন? অনেকেই আছেন যারা এই ধরনের মানসিক সান্তনা লাভ করারা সাথে সাথে অহেতুক এই মানসিক সান্তনা তা অন্যকে দিতেও উৎসাহিত করেন। ব্যাপারটা অনেক টা এ রকম,”o foxes cut your tails because it is ugly….!” কিন্তু অন্যের লেজ কাটার ব্যাপারে উনারা কেন আগ্রহী তা বোধগম্য হয় না।

এখন ডিজিটাল যুগ এই যুগে একটা বোতামের চাপে অনেক কিছুই জানা যায়। আর এই যুগেও যদি আমরা বলি ভাই আমি জানিও না বা আমি তো নতুন এটা বলে। সেই তেমনি মানসিক সান্তনাই পাবেন আর কিছু না। আর এটা বলে আপনি আপনার দায়িত্ব থেকে পালাতে পারবেন না। পরকালে যদি আপনি বলেন যে হুজুর রা আমাদেরকে এটা জানানি তাহলেও কিন্তু আপনি মাফ পাবেন না। আপনার নিজের দায়িত্ব হল জ্ঞান অর্জন করা আর আপনি সেই ফরজ তরখ করেছেন। সেই জন্য এ ক্ষেত্রে আপনার দুই ধরনের শাস্তি হতে পারে পরকালে। এক, না জানা বা জানার চেষ্টা না করা এবং দুই, পালন না করার।

যাই হোক, শীত প্রায় সমাগত, তাই অনেকের মনে কবুতর নিয়ে আজানা আতঙ্ক বিরাজ করছে শীতে অনেক কবুতর মারা যায়। আসলে তা সঠিক না। আপনি যদি আপনার কবুতরের সঠিক পরিচর্যা না করেন তাহলে শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা সব ঋতুতেই আপনার কবুতর মারা যাবে। আর আপনি যদি সঠিক পরিচর্যা করেন বা অলসতা না করেন। তাহলেই কেবল আপনি সফল খামারি হিসাবে পরিগণিত হবেন সন্দেহ নাই।

শীতের মাসিকঃ

দিন ১-৪ঃ পর্যন্ত সাল্মনিল্লা কোর্স করাতে হবে। (যেটা বিভিন্ন জন বিভিন্ন ভাবে করে থাকে, কিন্তু সবচেয়ে উপযুক্ত সাফি+ফেবনিল+মারবেলাস এর মিক্স কোর্স করা, অনুপাত তা এরূপ ২+২+১ টেবিল চামচ ।)

দিন ৫ঃ স্যালাইন দিন। (অথবা এর বদলে ভিটামিন সি দিতে পারেন যেমন লেবুর রস। ১ টি লেবু ১ লিটার পানিতে।)

দিন ৬-৯ঃ পর্যন্ত ভিটামিন বি কমপ্লেক্স দিন। (এক্ষেত্রে toxynil, biovit, vita B+C ইত্যাদি ভিটামিন দিতে পারেন। কারন এর অভাবে বেশীর ভাগ টাল রোগ হয়।)

দিন ৯-১০ঃ পর্যন্ত হমিও Kali Curb 30 দিন। (এটা ঠাণ্ডা জনিত সমস্যা থেকে প্রতিরোধ করবে।)


দিন ১১ঃ
রসুন বাটা+মধু+লেবুর রস। (১ লিটার পানিতে ২ চা চামচ রসুন বাতা,২ চা চামচ মধু আর ১ চামচ লেবুর রস মিক্স করে দিলে ভাল।তবে পানি অবশ্য ছেকে নিতে হবে। আর লেবু চিপার সময় গ্লভস বা লেমন ইস্কুইজার ব্যাবহার করবেন। এটা শরীর গরম রাখতে সাহায্য করবে।তবে খেয়াল রাখতে হবে যে এই কোর্স করার আগে কবুতরের ক্রিমির ঔষধ দিয়া আছে কিনা টা জেনে নিবেন। কারন ক্রিমি থাকলে এটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।)

দিন ১২ঃ হোমিও Belodona 30 (এটা আপনার কবুতর কে প্যারামক্সি ভায়রাস থেকে মুক্ত রাখতে সাহায্য করবে।)

দিন ১৩-১৬ঃ পর্যন্ত ক্যাল ডি,ভিটামিন K ও E ভিটামিন দিয়া ভাল। (এক্ষেত্রে Calcium Forte+AD3e+k Vitঅথবা Calbo D+Ad3e+k Vitদিয়া যেতে পারে। এতে শরীর গরম রাখতে সাহায্য করবেও ভিটামিন কে ডিমের ভিতর কবুতরের বাচ্চা মারা যাওয়া ইত্যাদি প্রতিরোধ করতে সাহায্য করবে। এগুলো আলাদাভাবে বা একসঙ্গেও দিতে পারেন। তবে ভিটামিন K টা আলাদা ভাবে দেবার চেষ্টা করবেন।)


দিন ১৭ঃ
স্যালাইন দিন। (অথবা এর বদলে ভিটামিন সি দিতে পারেন যেমন লেবুর রস। ১ টি লেবু ১ লিটার পানিতে।)

দিন ১৮-২১ঃ পর্যন্ত লিভার টনিক দিন। (অধিকাংশ কবুতর লিভার জনিত সমস্যায় বেশি ভুগে থাকে। তাই লিভার এর ব্যাপারে একটু খেয়াল রাখা জরুরি। এক্ষেত্রে হামদারদ এর Cinkara, Icturn, Karmina ইত্যাদি বা আপনার পছন্দ মতো ব্যাবহার করতে পারেন।)

দিন ২২ঃ হোমিও Tiberculinum 30 দিন।(এটি ধুলা জনিত সমস্যা থেকে প্রতিরোধ করবে।)


দিন ২৩ঃ
লিকার চা বা গ্রিন চা বা প্রবায়টীক দিতে পারেন। ( এটা কাঙ্কার প্রতিরোধ ও ভাল ব্যাকটেরিয়া উৎপাদনে সাহায্য করবে।)

দিন ২৪ঃ হোমিও Borax 30 দিন। (এটি বায়ু বাহিত রোগ থেকে প্রতিরোধ করবে।)
দিন ২৫ তারিখ অ্যাপেল সিডার দিন। (এক্ষেত্রে আমিরিকার তৈরি অ্যাপেল সিডার দিয়া উত্তম। এটা সাল্মনিল্লা প্রতিরোধে সাহায্য করবে।১ লিটারে ১ সিসি বা তার কম, বেশি প্রয়োগ করবেন না তাতে বিপরিত ফল হতে পারে।)

দিন ২৬-৩০ঃ পর্যন্ত মাল্টি ভিটামিন দিয়া ভাল। (এক্ষেত্রে pawer max(made in Vietnam),All Vit Ma(Made in Germany),Max grower (made in Holland) দিয়া যেতে পারে। এতে শরীর গরম রাখতে সাহায্য করবে। সকল ভিটামিন ও মিনারেলস এর অভাব পুরন করবে।)

দিন ৩১ঃ স্যালাইন দিন। (অথবা এর বদলে ভিটামিন সি দিতে পারেন যেমন লেবুর রস। ১ টি লেবু ১ লিটার পানিতে।অথবা সাধারন পানিও দিতে পারেন।)

প্রতিরোধক কিছু জরুরি ঔষধঃ

১) হোমিও deptherinum 200 ১ ফোঁটা করে মাসে বা ক্যালিমুর ৬ক্স ১ টা ট্যাবলেট মাসে দিতে পারেন। এতে ডিপথেরিয়া হবার সভাবনা অনেকটা কম থাকবে বা এর প্রতিরোধক হিসাবে কাজ করবে।

২) হোমিও Eupatorium Perfo. ১ সিসি= ১ লিটার পানিতে মিক্স করে সাধারন খাবার পানি হিসাবে পরিবেশন করবেন (মাসে ১ বার)।

(সতর্কতাঃ ২ ধরনের হোমিও ঔষধ একসঙ্গে ব্যাবহার করবেন না অনুগ্রহ করে।)

এই ছক যে আপনাকে অনুসরন করতেই হবে এমন কন বাধ্যবাধকতা নাই, এটা আপনার পছন্দ অনুযায়ী পরিবর্তন করে নিতে পারেন। তবে খেয়াল রাখবেন অসুস্থ কবুতর কে ভিটামিন বি কমপ্লেক্স ছাড়া অন্য কোন ভিটামিন দিবেন না। এটা তার ক্ষতি হবার সম্ভাবনা বেশি থাকে। আর অনেকে বয়লার গ্রয়ার বা এই ধরনের খাবার দিতে পছন্দ করেন। বিশেষ করে অসুস্থ কবুতরকে এই ধরনের খাবার দিয়া ঠিক না। একটা কথা খুব ভাল করে খেয়াল রাখতে হবে শীতে ক্রিমির ঔষধ ৪৫ দিন পর পর দিতে হবে, যদিও ছকে এটা উল্লেখ করা হয়নি। একটা জিনিষ আপনি খেয়াল রাখবেন সব সময় উপরের ছক একটা দিক নির্দেশনা মাত্র, এটা অত্যাবশ্যকীয় কিছুই না সাল্মনেল্লা, লিভার টনিক, বি কমপ্লেক্স, মাল্টি ভিটামিন ও ক্যালসিয়াম ছাড়া। আপনি যদি এই কয়টা করেন ঠিক মত আপনার আর কোন কিছু না করলেও চলবে। ব্যাপারটা অনেকটা এ রকম যে ঘর যত সুন্দর করে সাজাতে পারেন ততই দেখতে ভাল লাগবে আপনার। অনুরূপ ভ্যাকসিন এর ব্যাপারেও, অনেকে মনে করেন ভ্যাকসিনই সকল সমস্যার সমাধান। কিন্তু আসলে এটা ঠিক না। আপনি যদি ভ্যাকসিন দিতে চান তবে কবুতরের জন্য যে ভ্যাকসিন সেগুলো দিবেন। হাঁস বা মুরগির ভ্যাকসিন দিবেন না অনুগ্রহ করে। আতে আপনার কোন কাজে আসবেই না, বরং এতে আপনার কবুতরের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাবে।

“আর তোমাদেরকে যদি কেউ দোয়া করে, তাহলে তোমরাও তার জন্য দোয়া কর; তারচেয়ে উত্তম দোয়া অথবা তারই মত ফিরিয়ে বল। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্ব বিষয়ে হিসাব-নিকাশ গ্রহণকারী।“(সূরা আন নিসাঃআয়াত-৮৬)

লেখক : সোহেল রাবি ভাই