আমরা কি ধরনের খামারি ? (কবুতরের কেস স্টাডি)

আমাদের দেশে উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলে যে ধরনের হ জ ব র ল শিক্ষা ব্যাবস্থা, আমার মনে হয় দেশের ৯০% শিক্ষার্থীর এই সময়টা খুব একটা সুখকর ভাবে কাটে না। আমি স্কুল জীবনে খুব একটা ভাল মানের ছাত্র ছিলাম না কিন্তু সব সময়ই প্রথম বেঞ্চিতে বসতাম, আমার স্কুলে পৌঁছাতে দেরি হলেও আমার জন্য সেই জায়গাটা বরাদ্দ থাকত। প্রথম বা দ্বিতীয় ক্যাপ্টেন আমার জন্য সেই জায়গাটা রেখে দিত। যাই হোক, আমাদের প্রধান শ্রেণী শিক্ষক আমাদের, অংক, ইংরেজি, গ্রামার ও বিজ্ঞান ক্লাস নিতেন। প্রতিদিন ১০ টা অংক, ১ টা প্যারাগ্রাফ, ১০ টা অনুবাদ, ছাড়াও বিজ্ঞানের কোন না কোন বাসার কাজ দিতেন। সমাজ বিজ্ঞান শিক্ষক তো আরেক খাড়া উপরে তিনি প্রতিদিন ২ পাতা করে সমাজ বিজ্ঞান এর সেই কঠিন পড়া মুখস্থ করতে দিতেন আর পরদিন সেগুলো দাড়িয়ে তার সামনে বলতে হত না দেখে তিনি সামনে এমন ভাবে ছড়ি ঘুরাতেন যে জানা পড়াও অনেক সময় ভুলে যেতাম, বা যারা ভাল ছাত্র ছিল তারাও পর্যন্ত তার হাত থেকে রেহাই পেত না যদি না সে উনার কাছে প্রাইভেট পড়ত। এর পর ইসলামিয়াত শিক্ষক বিভিন্ন সুরার শানে নযুল ও সূরা গুলো মুখস্থ করতে হত।

টিফিন পিরিয়ডে ৪০ মিনিট সময় পাওয়া যেত, এর মধ্যেই নাস্তা এরই মধ্যে নামাজ কারণ টিফিন ব্রেক এর পরে আরবি শিক্ষক এর ক্লাস আর যদি নামাজ না পড়ি তাহলে শাস্তির পরিমান দ্বিগুণ, ফলে অনেক সময় নামাজ পড়ে টিফিন করার সময় পাওয়া যেত না। আর সেই কারনে কোন রকমে ১ টাকার বার ভাজা খেয়েই টিফিনের কাজটা সারতে হত। আর একারনেই আজ অনেক বছর পরও সেই সময়ের অনিয়মের বোঝা আজও বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। সেই আরবি ক্লাসে প্রতিদিন ১০-১৫ নতুন আরবি শব্দ প্রতিদিন মুখস্থ করতে হত। ইংরেজি রচনার জন্য একজন শিক্ষক যিনি সপ্তাহে ২ দিন ক্লাস নিতেন, তাকে প্রতি ক্লাসে একটা করে ইংরেজি রচনা মুখস্থ বলতে হত। আর এসেম্বলি রোদের মধ্যে ৪০ মিনিট প্রাণঘাতী ছিল। এর পর আবার সিনিয়র ও জুনিয়র সমস্যা। সিনিয়র দের সামে কমরে হাত দিয়ে দাঁড়ান যাবে না। পায়ে পা তুলে বসা যাবে না। উনাদের সামনে আড্ডা মারা যাবে না। আর এর উল্টো হলে, তার কপালে কি হত সেটা না হয় নাই বললাম। এভাবেই জীবনের উচ্চ বিদ্যালয়ের ৫ বছর পার করেছি। মাঝে মাঝে পড়ার চাপ এত বেশী হত যে অসুস্থ হয়ে পড়তাম বা স্কুল কামাই দিতাম। পরে হয় জরিমানা দিতাম বা অবিভাবক এর আবেদন পত্র জমা দিতাম। সেই সময়ের দুঃসহ সৃতি নিউরো সেলে বা ২৩ জোড়া ক্রমসমের কোন জায়গাই এমন ভাবে জেঁকে বসে গেছে। যে আজ জীবনের অনেক বছর পার হলেও মাঝে মাঝে রাতে ঘুমের মধ্যে সেই সময়ের স্বপ্ন দেখলে ভয়ে ঘেমে উঠি, আর ঘুম থেকে জেগে উঠে একগ্লাস পানি খেয়ে ঘাম মুছতে মুছতে মহান আল্লাহ্‌ তালার কাছে শুকরিয়া আদায় করি, যে কমপক্ষে আল্লাহ্‌ সেই কঠিন সময়টা তো পার করিয়েছেন। আমাদের সেই হ য ব র ল শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে আমরা কেউই খুব ভাল না জানি অংক,না জানি ভাল ইংরেজি, না জানি ভাল বিজ্ঞান, না জানি ভাল ধর্ম। আমেরিকার এক জরিপে দেখা গেছে ৭০% সঠিক ভাবে জানে না মানুষের পাকস্থলী কোথাই অবস্থিত। আর জানার দরকার নাই। কারণ তারা কেউই ডাক্তার না। আর তাদের মতে এগুলো জানবে ডাক্তাররা, এটা তাদের জানার দরকার নাই। একজন বিখ্যাত মনিষী বলেছিলেন, যে জিনিষ ক্যালকুলেটরে একটা বতাম চিপে বের করা যাই সেটা মনে রাখার দরকার নাই। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হয়। কারণ আমাদের সাধারন একটা অফিস সহকারী পদের জন্য বিশ্বের কোথাই বেশী হাতি আছে? আর চাঁদে কি আছে, সমুদ্র তলদেশে কি আছে সেই সব প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়! আর সেটা সেই পদের সঙ্গে সম্পর্ক থাকুক আর নাই থাকুক, কিছুই যায় আসে না।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কবুতর খামারি দের দিকে যদি লক্ষ্য করি তাহলে দেখব এক এক খামারি এক এক জাতের কবুতর ব্রীড করছে। আর তাতে তাদের সমস্থ মেধা প্রয়োগ করছে। ক্রস ব্রীড, আউট ব্রীড, লাইন ব্রীড করে তারা ভাল জাতের কবুতর উৎপাদন করছে। খুব কম খামারিই আছেন যারা সব জাতের কবুতর এক সাথে ব্রীড করছেন। কিন্তু আমাদের দেশে সেই জগা খিচুরি শিক্ষা ব্যাবস্থা থেকেই হোক, আর যে কারনেই হোক একজন ব্রীডারের কাছে সব ব্রীড থাকতে হবে। তা নাহলে সে খামারি না। আমরা অনেক সমই ভুলে যাই, যে আমাদের দেশে সবাই কবুতর বিক্রি করে পেট চালাই না। ফলে যিনি কবুতর বিক্রি করে পেট চালান আর যিনি শখের বসে পালেন তাদের ২ জনের খামারের পরিবেশ এক হবে না বা হবার কথাও না। একজন পেশাদার কবুতর খামারির কাছে যে কবুতর থাকবে, একজন সৌখিন কবুতর খামারির কাছে সে কবুতর নাও থাকতে পারে।

কিন্তু আমরা আমাদের চিন্তাধার অন্যের মধ্যে চাপিয়ে দিয়ার চেষ্টা করি সব সময়। আমাদের চিন্তাধারা আমি যেমন আমার ছেলেও সে রকম হবে, কিন্তু আমরা ভুলে যাই তার চিন্তা চেন্তনা তার থেকে ভিন্ন হতেও পারে। ছাগল ও ভেড়া কে কেউ যদি দড়ি ধরে টেনে নিতে চাই তাহলে সেটা পারবে না। কিন্তু তাদের একটাকে কেউ কোলে তুলে যদি নিয়ে যাই, তাহলে বাকিগুলো সবাই সেটাকে অনুসরন করতে থাকবে, সে যেখানেই যাক না কেন। আমাদের চিন্তা চেতনায় কোথাই যেন, এই প্রাণীর সাথে বিচিত্র কারনে মিল পাওয়া যাই, আমাদের ক্রমসমের কোন এক জোড়ার সাথে হয়ত তাদের তাদেরটা মিশে গেছে। কারণ টা না হলে কবুতর খামারিরা কেন এক জন এক ব্রীড কিনেই সবাই কেনার জন্য হিরিক পরে যাই, কেন আমরা বুঝি না যে সবাই যদি এক দিকে ছুটি তাহলে জিনিষটার ভারসাম্যহীনতা ঘটবে। আর ফলে সবাইকে তাতে ভুগতে হবে।

সেদিন এক অনুষ্ঠানে কবুতরের বড় বড় সব ব্রীডাররা জ্বালাময়ী সব বক্তৃতা দিলেন, আমদানি কারকদের তুলোধোনা করে ফেললেন। তাদের কাছেই সব গুলো ভাল ব্রীড আছে সেটাও শুনাতে ছাড়লেন না। যাই হোক, কিছুজন আবার বিদেশী ঔষধের কথাও বললেন যে আমাদের দেশে বিদেশ থেকে ঔষধ আমাদানি করছে কিছু লোক, আমাদের দেশি ঔষধ অনেক ভাল ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু তিনি খেয়াল করেনি যে তার পিছনেই প্রজেক্টরে বিভিন্ন বিদেশী ঔষধের বিজ্ঞাপন চলছিলো আর তারই পাশের সেগুলো কেনার হিড়িক। এই ব্যাপার টা দেখে আমার মনে পরে গেল সেই কথা, “মোল্লা যা বলে তা শুন কিন্তু যা করে তা করোনা।“

আজ থেকে দুই বছরেরও আগে আমি আমার এক পোস্ট এ যখন এই সব ব্রীডাররা আমদানি কারকদের কাছে সকাল বিকাল ধরনা দিতেন আর আমদানি করা রিং এর কবুতরের বাহারি ছবি বিভিন্ন সামাজিক সাইট গুলোতে গর্ব ভরে দিতেন, আমার নতুন কালেকশন এনপিএ ব্র্যান্ডেড বা ই ই রিং ২০১০ ইত্যাদি তখন বলেছিলাম যে এভাবে চলতে থাকলে এক সময় আসবে যখন সবাইকে লোক দিয়ে মাথাই করে কবুতর বিক্রি করতে হবে বা বাসার ফ্রাইং প্যানে ফ্রাই করে খেতে হবে। তখন তাদের মনে এসব কথা মনেও হইনি, কারণ তখন তারা তাদের ঘড় গুছাতে ব্যাস্ত ছিলেন। তারা খেয়ালি করেনি যে তাদের নিজের অজান্তেই তাদের ঘরে যে আগুন লেগেছে সেই আগুন তাদেরকেও পুরাতে পারে। আজ যখন সেই আগুনে তাদের গা পুঁড়া শুরু হয়েছে তখন টনক নড়েছে। আরে কি হচ্ছে, হই হই রৈ রৈ …!!! করে বেড়াচ্ছেন বাঁচানোর জন্য, কিন্তু তারা ভুলে গেছেন, তাদেরকে কে বাচাবে? যখন আক্রান্ত সবাই। বিড়ালকে মাছের হাড়ি চিনিয়েছে কারা, আর আজ যদি সব বেড়াল সেই সব হাড়ীর খোঁজে বের হয়ে পরে তারা কি করতে পারবেন? আজ যখন এই সেক্টরটা সকটাপন্ন তখন তারা সেই স্কুল জীবনের সিনিয়র আর জুনিয়র কল্কী হাতে নিয়ে টান দিয়ে ধুয়া ছাড়ছেন। কিন্তু তাদের কে মনে রাখতে হবে একটা সময় পর সিনিয়র ও জুনিয়র এর কোন ভেদাভেদ থাকে না। আর আপনি যদি এটা চিন্তা করেন তাহলে আমি বলব, আপনি মূর্খের রাজ্যে বাস করছেন এখনও অথবা আপানি একজন জ্ঞান পাপী ছাড়া আর কিছুই না। আমরা ফরজ কাজের খোজ রাখি না কিন্তু সুন্নত ও নফল নিয়ে টানাটানি করি। এই প্রসঙ্গে এক গল্প না বললেই নয়, একবার এক হুজুর এক গ্রামের মসজিদে বয়ান দিলেন যে, পাগড়ি পড়া সুন্নত, তো একদিন হুজুর গ্রামের ক্ষেতের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। সেই খেতে এক গ্রাম্য কৃষক কাজ করছিল লুঙ্গি পরে খালি গায়ে। হুজুর কে দেখে তার বয়ান এর কথা মনে হতেই, তাড়াতাড়ি করে সে লুঙ্গি টা খুলে পাগড়ি বানিয়ে মাথাই দিল, এদিকে তার নিচের দিকে কোন কাপড় না থাকাই হুজুর তাড়াতাড়ি চোখ ঢেকে বললেন আরে কর কি কর কি? কৃষক অবাক হল, হুজুরের এই ধরনের প্রশ্নে, সে বলল হুজুর আপনে না বলেছেন যে, পাগড়ি পড়া সুন্নত? হুজুর বলল, আরে মিয়া আগে ফরজ আদায় কর তারপরই সুন্নত পালন করবে। আমাদের দেশে কবুতর সেক্টরে আরেকটা বড় সমস্যা সেটা আমার স্কুলের মতই সিনিয়র জুনিয়র সমস্যা, এই ভুত আমাদের মাতা থেকে নামে না। তারা ভুলে যান যে, বয়সের একটা সম্যে বয়সের এই বাঁধ থাকে না থাকতে হয় না। তাহলে আপনি জীবনে চলার পথ হারিয়ে ফেলবেন।

আমাদের এই সেক্টরের লোকজন কবুতরের আমদানি কারকদের উপর দোষারোপ করে নিজেরা নিজেদের দোষ ঢাকার এক অপচেষ্টা করছেন মাত্র। আমাদের দেশে কবুতর সেক্টরের এই অবস্থার জন্য আমদানি কারকরা যতনা দায়ী, তার থেকেও দ্বিগুণ দায়ী আমাদের মানসিক অবস্থা আর আমাদের নৈতিকতা। আমাদের এক জন বড় ব্রীডার ২-৩ হাজার টাকার লোভ সামলাতে পারে না। ফাটা কবুতরের পর তুলে বিক্রি করে। অসুস্থ কবুতর কে চালিয়ে দেয় সুস্থ বলে। নতুন খামারি কে উৎসাহিত করার বদলে ঘার মটকে কিভাবে খাওয়া যায় সেটাই চিন্তা করে। আর এটা দিনের পর দিন চলে আসছে! এটা কেন হবে? আমরা কি মনে করি না যে আমাদের কেউ কবরে যেতে হবে ২ দিন আগে বা পরে? আমরা কি ভুলে গেছি আজ যাদের জন্য আমি গর্ত খুঁড়ছি কালকে সেই গর্তে আমাকেও পড়তে হতে পারে! তাহলে কেন…এই সব বাটপারি…কেন এই সব জচ্চরি…?!

আমাদের কিছু সৌখিন ব্রীডার এই সব অবস্থা দেখে কবুতর পালাই ছেড়ে দিয়েছেন। আরে ভাই মাথা ব্যাথা হলে যদি মাথা কেটে ফেলাই সমাধান হত তাহলে তো কোন সমস্যাই থাকত না। আর সব কারনের ফলেই সেই সব খামারিরা আমদানি করা কবুতর কিনতে আগ্রহী হয়েছেন। আর আজ আমরা বুঝতে পারছি আমরা কি করছি। আমাদের কিছু ব্রীডার পাশের দেশে কবুতর পাঠাতেন, তখন তাদের কোন অসুবিধা হয়নি। আর লোকাল কবুতর বাজার নিয়ে তাদের তখন কোন ম্যাথাব্যাথাও ছিল না। কারণ তখন তারা লোকাল বাজার থেকেই বেশী দাম পাচ্ছেন। কিন্তু আজ যখন সেটা বুমেরাং হয়ে গেছে তখন তাদের আত্মা কেপে উঠেছে। তখনি সেই সব কবুতর সেক্টরের সমাজপতিরা সোচ্চার হয়ে উঠেছেন কি করা যায় কি করা যাই। কিন্তু প্রবাদ আছে, “ভাবিয়া করিও কাজ করিয়া ভাবিও না!” আমাদের দেশে আমদানিকারক আর বিক্রেতা, ট্রেডার আর তথাকথিত ব্রীডারদের অত্যাচারে যখন প্রান ওষ্ঠাগত তখন ক্রেতার অস্থিরতা আর এক মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। সেদিন এক আমদানি কারকের বাসাই গিয়ে এক ক্রেতা তার কাঙ্ক্ষিত কবুতর না পেয়ে এমন ভাবে হাঁ হুতাস করতে শুরু করলেন মনে হল যেন সেই কবুতরটা উনার জীবন রক্ষা কারী ঔষধ আর ওটা না পেলে উনি এখনি মারা যাবেন। এই এই সুযোগ গুলোই সবাই গ্রহন করেন। কাঁচা মরিচের দাম যখন ১০০ টাকা তখন আপনার তো সেটা কিনার দরকার নাই বা আপনার যদি বিকল্প কিছু থাকে। কিন্তু না আমরা তার পিছনেই দৌড়াতে পছন্দ করি। যাই হোক প্রকৃতি,সময় মানুষকে সব কিছু শিখতে বাধ্য করে, আর আশা করি হয়ত অচিরেই মানুষ শিক্ষা নিবে না হয় চরম মূল্য দিতেই থাকবে অনন্ত কাল, যতক্ষণ না নিঃশেষ হয়ে যায়।

“আর যে সম্পদকে আল্লাহ তোমাদের জীবন-যাত্রার অবলম্বন করেছেন, তা অর্বাচীনদের হাতে তুলে দিও না। বরং তা থেকে তাদেরকে খাওয়াও, পরাও এবং তাদেরকে সান্তনার বানী শোনাও।“(সূরা আন নিসাঃআয়াত-৫)

লেখক : সোহেল রাবি ভাই