নতুন খামারি ও কবুতর পালকদের জন্য কিছু জরুরি কথা (কবুতরের কেস স্টাডি)

আমাদের দেশে ছোট বেলার রাজার গল্পে কৃষকের ছেলে রাজার মেয়েকে বিয়ে করে অর্ধেক রাজত্ব পেল আর সুখে শান্তিতে বাস করতে থাকল অথবা বাংলা সিনেমা যদি দেখি তাহলে দেখব নায়ক যেকোনো একটা ঘটনা ঘটিয়ে, দৌড়াতে শুরু করল, আর দৌড়াতে দৌড়াতে বড় হয়ে, একজন সফল ব্যাবসায়ি বা একজন নামকরা ব্যাক্তি বা একজন নামকরা ডন হয়ে গেল। বা নায়কের মা নায়ককে কোলে নিয়ে গান গায়তে গায়তে নায়ক বড় হয়ে গেল ও একজন সফল মানুষ হয়ে গেল। এটাই হল অধিকাংশ বাংলা সিনেমার বা শিশুতোষ গল্পের চিত্র। আর এসব থেকেই আমার খুবই সংক্ষেপে সফল হবার একটা মানসিক প্রবনতা আমাদের প্রায় অধিকাংশ মানুষের মধ্যে কম বেশী বিরাজ করে। কিন্তু বাস্তব জীবনে এটা হয় না এত সহজে।

কবুতরের আদর্শ জোড়া প্রস্তুত ও সঠিক প্রজনন প্রণালী বা ভাল মানের বা ভাল জাতের কবুতর প্রজনন (ব্রিডিং) খুব একটা সহজ ব্যাপার না। আর একজন সফল বা আদর্শ খামারি হওয়া ছেলেখেলা না। কথায় আছে একটি কবুতর ১২ মাসে ১৩ বার ডিম বাচ্চা করে। আর আপনি যখন আপনার বাসার পাশে এ রকম খামারি কে দেখবেন যে সে প্রতিমাসে লক্ষ লক্ষ টাকা আয় করতেছেন। তখন একজন নতুন খামারি এরই স্বপ্নে বিভোর হয়ে কবুতর পালা শুরু করে। আর এর পরই শুরু হয় তার অগ্নি পরীক্ষা। প্রথমেয় সে কোন বাছ বিচার না করেই কবুতর কিনে এক জায়গা থেকেই কোন পরিশ্রমের তোয়াক্কা না করেই। সেই বাংলা সিনেমার মত, আর এটাই একজন নতুন খামারির সবচেয়ে বড় ভুল। যাই হোক একজন আদর্শ খামারি যদি বছরে ৪-৫ জোড়া ভাল মানের বাচ্চা তুলে বড় করতে পারে ঠিকমত তাহলেই কেবল একটু স্বস্তির বা শান্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটার ব্যাতিক্রম হয়। বাচ্চা বড় করা ত দূরের কথা ব্রিডিং জোড়ার বাচাতেই ব্যাতিবাস্ত থাকতে হয় অনেক সময় অধিকাংশ খামারিকে। অনেক সময় ব্যাপারটা এ রকম হয় যে ভিক্ষা চাই না কুত্তা সামলানোর মত অবস্থা হয়।

একজন খামারি কে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন রোগ বালায়ের পাশাপাশি বিভিন্ন ভিইরাল সংক্রমন,ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমন, ডিমের ভিতর বাচ্চার মৃত্যু, অনুরবর ডিম, নেষ্ট এ বাচ্চার মৃত্যু, একটু বড় অবস্থায় বাচ্চার মৃত্যু, প্রতিদিন খাবার ও পানি সরবরাহ ও নিয়মিত চেক করা, চরম আবহাওয়া (আতি গরম বা শীত বা বৃষ্টি)। এ সব প্রতিকুলতা সামাল দিতে গিয়ে একজন খামারি অনেক সময় ক্লান্ত ও বিরক্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু তারপরও তাকে অনিচ্ছা সত্ত্বেও এ সব বিষয় দেখতে হয় দিনের পর দিন। আর এ ক্ষেত্রে একজন খামারির অধিক ধৈর্যই এ সব প্রতিবন্ধকতা দূর করে সফলতা এনে দেয়। আর এই ধৈর্য একজন খামারি অর্জন করে অনেক দিন ধরে, যদিও ধৈর্য ও অভিজ্ঞতা কেউ যদি একজন খামারির সফলতা ধরে নেয়, তাহলেও একটু বিতর্ক থেকেই যায়। কারন এর সঙ্গে ভাগ্যও কিছুটা আপনার সাথে থাকতে হবে! যেমন আপনি হইত আপনার অভিজ্ঞতা ও ধৈর্য সহকারে খামার পরিচালনা করছেন ঠিকমত, হটাত দুর্ভাগ্য এসে আপনার খামারে বাসা বাধল, তাহলেও বেশী সময় লাগবে না, খুবই অল্প সময়েই আপনার খামার ঝড় বাতাসের মত লণ্ডভণ্ড করে চলে যাবে। আপনি কিছু বুঝে উঠার আগেই। একজন নতুন খামারি হিসাবে আপনার কিছু করনীয় আছে, সেগুলো কি?

১) জায়গা নির্বাচন।

২) কবুতর নির্বাচন করা। আর এ জন্য প্রথম পর্যায়ে দামি কবুতর না তুলে ছোট অল্প দামি কবুতর দিয়ে খামার শুরু করা ভাল।

৩) খাঁচা, ঔষধ প্রাপ্তিস্থান ইত্যাদি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ।

৪)কবুতরের বাজার পর্যবেক্ষণ ও বিক্রেতা সম্পর্কে ধারনা সংগ্রহ। (যেমনঃ কবুতর বাজার টা খুব একটা বড় বাজার না যদিও এটা একটা বড় বাজার হতে পারত, কিন্তু কিছু কারনে এটা এখন হয়ে উঠেনি। ফলে বিক্রেতা সম্পর্কে ধারনা নেয়াটা খুব একটা কঠিন ব্যাপার না। আর আস্তে আস্তে, অল্প অল্প করে, একজোড়া দুইজোড়া করে সংগ্রহ করুন।

৫) একজন ভাল ও বিশ্বস্ত বন্ধু নির্বাচন করুন। যিনি আপনাকে রোগ ও কবুতরের ব্যাপারে ভাল কিছু উপদেশ দিবেন। কারন অধিকাংশ মানুষ এ ব্যাপারে হিংসা পোষণ করে, ফলে হিতে বিপরীত হয় বা হতে পারে।

৬) কবুতর কেনার সময় ভাল করে যাচাই করে নেয়া। পরিচিত না হলে পুরনবয়স্ক কবুতর না নিয়া। তবে বাচ্চা কবুতর একজন নতুন খামারিদের বেশী প্রাধান্য দিয়া উচিৎ। যদিও এক্ষেত্রে সুবিধা যেমন অসুবিধাও তেমন বাচ্চা নিলে আপনি আপনার খামারের পরিবেশ ও খাদ্য তালিকার সাথে খাপ খাওয়াতে পাড়বেন। তবে সেক্ষেত্রে দুটাই নর বা দুটাই মাদী হবার সভাবনা থেকেই যাই তার পরও অসুবিধার থেকে সুবিধাটাই বেশী। অনুরূপ ভাবে পুরনবয়স্ক কবুতর নিলে আপনি হয়ত জানতেও পারবেন না যে এটা কত দিন বা কতবার ডিম বাচ্চা করেছে। যেহেতু আমাদের চরিত্র ফুলের মত পবিত্র তাই হয়ত ১০ বছর বয়স হলেও বলবে এইত ২-৩ বছর, আর সেক্ষেত্রে আপনি কবুতর কে বাসাই এনে আর বড় জোর ৫-৬ বার সফল ভাবে ডিম বাচ্চা করলেন, এর পর হয়ত আর ভাল বাচ্চা তুলা সম্ভব হয়না। কিন্তু আপনি যদি জিজ্ঞাস করেন তাহলে হয় বলা হবে বিশ্রামে গেছে। কিন্তু অনেক সময় সেই বিশ্রাম আর শেষ হয় না চূড়ান্ত বিশ্রামের আগে।

৭) কবুতর কেনার আগে ভাল করে এর পায়খানা পরীক্ষা করে নিবেন, মুখের ভিতর পরীক্ষা করবেন, হাতে ধরে দেখে নিবেন যে এর শারীরিক অবস্থা কেমন? যদিও অনেক সময় একজন বিক্রেতা যে খাঁচায় ড্রপিং ভাল সে খাঁচায় রেখে দেখানোর চেষ্টা করেন যে কবুতরটা সুস্থ। এর পরও অনেক সময় নানা কারনে নতুন জায়গাই আসার পর পরিবেশ, খাবার, ভ্রমন ইত্যাদি কারনে একটু অসুস্থ হয়ে যেতে পারে, আর এ জন্য এ সম্পর্কে কিছু প্রাথমিক ধারনা নিতে হবে।

৮) রিং এর ব্যাপারটা যেন আপনার মাথায় বা গলায় রিং পরিয়ে না দেয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। আপনাকে কবুতরের আকার,মারকিং ও জাতের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। সেটা রিং হোক বা রিং ছাড়াই হোক। যদিও আজকাল অনেক ভাল খামারি নিজেরাই রিং এর ব্যাবস্থা করে ও আমদানি করা রিং বলে চালাচ্ছেন। এদিকে একটু খেয়াল রাখতে হবে।

৯) খামার বা কবুতর পালা শুধু ব্যাবসায়িক চিন্তা করে পালবেন না অনুগ্রহ করে। এই প্রাণীটির প্রতি যদি আপনার ভালবাসা বা ভাললাগা না থাকে তাহলে এর চিন্তা মাথা থেকে ঝেরে ফেলুন, আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি আপনি এক্ষেত্রে ব্যর্থ হবেনই হবেন। কোন সন্দেহ নাই তাতে।

১০) আপনাকে কবুতর পালার জন্য একটি সার্কেল তৈরি করতে হবে যারা কবুতর সম্পর্কে জানে ও যে আপনাকে এ ব্যাপারে নিয়মিত সাহায্য করতে পারে।

১১) রোগ চিকিৎসার ক্ষেত্রে একজন অভিজ্ঞ লোকের পরামর্শ নিবেন তা না হলে নানা জনে আপনাকে না উপদেশ দিয়ে বিভ্রান্ত করে ফেলবে। ফলে সেটা আপনার জন্য একটা কাল হয়ে দাঁড়াবে। একটা কথা মনে রাখবেন এই সেক্টরে গুনির সংখ্যা অনেক বেশী, আমরা সবাই একটু বেশী জানি আর তাই আপনি যদি কিছু জিজ্ঞাস করেন কাওকে না জানলেও তিনি টা জানেন। তাই এই ব্যাপারে একটু সতর্ক হবেন।

১২) পরিশেষে আপনার যদি এই প্রাণীটির প্রতি আকর্ষণ বোধ করেন আর আপনার যথেষ্ট ধৈর্য থাকে আর আপনার যদি মনে হয় আপনি অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত তাহলেই কেবল আপনি পারবেন আর তা না হলে এই চিন্তা করতেও যাবেন না। অন্যের দেখাদেখি কবুতর পালতে যাবেন না বা মানুষ কে এই কথা বলার জন্যও না যে আপনি দামি কবুতর পালেন। বা আপনার মনে যদি এই চিন্তা আসে যে অমুক কবুতর পেলে অনেক টাকা কামাচ্ছে তাহলে আমি কেন পারব না? আপনার এহেন চিন্তা থেকেই বলতে পারি আপনি পারবেন না ! কেন পারবেন না…সেটা নিয়ে আরেকদিন হয়ত আলোচনা করব।

আল্লাহ্‌ কোরআন এ বলেছেন,”আর তোমরা আকাঙ্ক্ষা করো না এমন সব বিষয়ে যাতে আল্লাহ তা’আলা তোমাদের একের উপর অপরের শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। পুরুষ যা অর্জন করে সেটা তার অংশ এবং নারী যা অর্জন করে সেটা তার অংশ। আর আল্লাহর কাছে তাঁর অনুগ্রহ প্রার্থনা কর। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তা’আলা সর্ব বিষয়ে জ্ঞাত।“(সূরা আন নিসা : আয়াত-৩১)

মূল লেখক : সোহেল রাবি ভাই