কবুতরের রিং (কেস স্টাডি)

রিং! রিং!! রিং!!! জি না এটা কোন টেলিফোনের শব্দ না। এটা কবুতরের পায়ে লাগানো একটা ডিভাইস। যা আজ একটা ব্যাবসায়িক হাতিয়ারে পরিনত হয়েছে। আজকাল মানুষ রিং এর কথা শুনলেই পাগল পারা হয়ে যায়,আর তাই যে কবুতর এর স্বাভাবিক দামের থেকে ৩ গুন ৪ গুন বেশি দামেও কিনতে পিছপা হয়না। কি এই রিং ? কি তাঁর মহাত্ত ? আর কেনই বা এটা লাগানো হয়। এসব কিছুই অনেকেই জানেন না, কিন্তু তারপরও রিং এর প্রতি একটা অলিখিত টানে মানুষ ছুটে আসে এই রিং লাগানো কবুতরের কাছে। আর এই সুযোগে কিছু দু পয়সা কামিয়ে নিচ্ছে সেই সব চালাক অসাধু লোকজন। আর তাই রিং এর ব্যাবসাও বেশ রমরমা।

কিন্তু আমরা কেউ কি আজ পর্যন্ত জানতে চেয়েছি বা জানার চেষ্টা করেছি কি এই রিং? কেন এটা লাগানো হয়? আর কি এর উদ্দেশ্য? মনে হয় না। যদি তাই হত তাহলে এভাবে আমরা রিং পিছনে ছুটতাম না। এই ত কিছুদিন আগে নেটে একজন নামকরা কবুতর ব্যাবসায়ি একটা স্ত্রেসার এর বিজ্ঞাপনে লিখলেন রিং এর জরা,ভাল ব্লাড লাইন, ইত্যাদি কিন্তু দেখা গেল সেই জোড়াটা ফাটা,তারপর কিভাবে রিং বলে চালানর চেষ্টা করা হল? কারন সে জানে যে আমরা রিং শুনলেই দৌর দিব। আর এইসব বায়বসায়ি রা সে অপেক্ষাই করে। অনেকেই গর্ব ভরে বলে থাকেন আমার একটা রিং পেয়ারের বাচ্চা কিনেছি। আসলেই কি তিনি এব্যাপারে সঠিক খোঁজ নেবার চেষ্টা করেছেন যে,আসলেই কি সেটা রিং এর জোড়া। নাকি অন্য কিছু। আমাকে একদিন একজন জানালেন যে তাঁর একটা রিং এর পেয়ার আছে তাকে জিজ্ঞাস করলাম ভাই রিং এর পেয়ার বলতে কি বুঝেন? তিনি জানালেন যে যার কাছ থেকে কিনেছি তিনি বলেছেন যে এটা রিং এর পেয়ার!কি আশ্চর্য! এর কি কোনই প্রতিকার নাই। হা আছে। কিভাবে? শুধু আপনাকে সচেতন হতে হবে। আগেও রিং বা ব্যান্ড নিয়ে লিখা সংক্ষেপে লিখা হয়েছে। কিন্তু মনে হয় সেটা যথেষ্ট হয়নি। এখন আসুন আবার আমরা একটু জেনে নেই রিং কি? কেন রিং পরান হয়? আর কি এর উদ্দেশ্য?

সাধারণত একটি ধাতু, প্লাস্টিক,ব্যান্ড যা একটি সজ্জা বা প্রবৃত্তি বা একটি টোকেন হিসাবে আঙুল বা পায়ের ভিতর নিবদ্ধ থাকে বা রাখা হয়। অন্য ভাবে বলা যায় যে পরবর্তী প্রজন্ম সনাক্ত করার জন্য একটি রিং অথবা ক্লিপ যা পাখি বা কবুতর খামার বা মালিকের পরিচিতি বহন করে থাকে। অনেক সময় প্রতিযোগিতার মাধ্যমেও সবচেয়ে ভাল জাতের কবুতর বা পাখি কে প্রতিযোগিতা আয়োজক কমিটি কবুতর বা পাখির মালিককে নির্দিষ্ট সনদপত্র সহ একটি নাম্বার খচিত রিং লাগানো মালা প্রদান করে, ফলে সেই কবুতরের মালিক সেই রিং নাম্বার দিয়ে তাঁর কবুতরের পরবত্তি প্রজন্মকে সেই নাম্বার অনুযায়ী রিং পরায়। অনেক সময় রেস কবুতর যাতে হারিয়ে না যায়, সেদিকে খেয়াল রেখে মালিকের সেল নাম্বার খচিত রিং বা রেজিঃ নাম্বার দিয়ে রিং পরায়। যা পরবর্তীতে সেই কবুতর কে খুজে পেতে সাহায্য করে থাকে। অনেক সময় কোন খামারের পরিচয় বা ব্যাক্তি পরিচয় রিং এর মধ্যে প্রকাশ করা হয়। আবার অনেক সময় রেস কবুতরের রক্ত পরিচয় মনে রাখার জন্য খামারি তাঁর একটা নিদিষ্ট পরিচয় নাম্বার রিং এ লিখে তাকে পরিয়ে দেয়। এভাবেই রিং এর সুত্রপাত হয়। সৌখিন কবুতরের রিং মুলত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সেরা জাতের নিদিষ্ট চরিত্রের কবুতরকেই দেওয়া হয়। বাংলাদেশের বাইরে এই ধরনের নিয়মিত প্রতিযোগিতা হলেও আমাদের দেশে এই ধরনের প্রতিযোগিতা সচারচর দেখা যায় না। কিন্তু তারপরও রিং এর ছড়াছড়ি। নিদিষ্ট জাতের না হয়েও আমরা অবলিলায় লিখে দিই রিং এর জোড়া, বা রিং এর পরিবার থেকে ইত্যাদি ইত্যাদি। এটা আমাদের দেশে অহরহ ঘটে কারন, আমাদের দেশে কবুতরের কোন শক্তিশালী সংগঠন নাই। যদি থাকত তাহলে এটা কোন কালেই কার পক্ষে এই ধরনের কাজ করা সম্ভব হত না।

আমাদের সকলের উচিৎ যদি আমদানিকৃত ব্র্যান্ড কবুতর না হয় বা আমদানিকৃত ব্র্যান্ড কবুতরের বাচ্চা না হয়। তাহলে আপনার খামার বা আপনার নিজস্ব পরিচয় বহনকারী রিং লাগানো। যাতে পরবর্তীতে সেই ব্রীড আপানার খামারের পরিচয় বহন করে। অনেকে আবার রিং পরাতে গিয়ে কবুতর কে একটা মহা যন্ত্রণা দায়ক অবস্থার মধ্যে ফেলে। তাই আপনাকে এ ব্যাপারে কিছু নিদিষ্ট নিয়ম মেনে চলতে হবে।

pigeon ring

আপনি যেহেতু আপনি ম্যানুয়াল রিং পরাবেন তাই আপনাকে নিম্নোক্ত কাজ নিশ্চিত করতে হবে ঃ

১) ডান পায়ের উপর রিং লাগাতে হবে।.
২) কবুতর কে উল্টায়ে রিং পরাতে হবে আর খেয়াল রাখতে হবে যাতে রিং এ অধিষ্ঠিত অক্ষর পাঠযোগ্য হয়।
৩) ডান পায়ের নেভিগেশন রিং রাখুন ও বাপ পায়ে রেসিং এর জন্য রিং মুছে ফেলা বা খুলে ফেলা নিশ্চিত করুন।
৪) ৫ থেকে ৭ দিনের মধ্যে রিং বা ব্যান্ড লাগানো উচিৎ, যাতে ব্যান্ড লাগানো সহজ হয়। আর আপনাকে খেয়াল রাখতে হবে যেন রিং বা ব্যান্ড বেশি টাইট না হয় বা বেশি ঢিলা না হয়।
৫) রিং বা ব্যান্ড লাগানোর সময় আপনাকে পিচ্ছিলকারক পদার্থ ব্যাবহার করা উচিৎ বা মেশিন ব্যাবহার করতে হবে আর খেয়াল রাখতে হবে যাতে লাগানোর সময় পা কেতে না যায়। এতে পায়ে ধনুষ্টংকার বা bumble foot হবার সম্ভাবনা থাকবে।
৬) মেটাল বা প্লাস্টিক যে কোন ধরনের রিং হোক না কেন নিয়মত পাদদেশ মুছা এবং পরিষ্কার অথবা ময়লা হলে ভাল কিছু পরিস্কার পদার্থ দিয়ে পরিস্কার করা নিশ্চিত করুন।
৭) যে সব কবুতরের পায়ে বেশি লোম বা মোজা হয় তাদের রানের মধ্যে রিং বা ব্যান্ড লাগানো উচিৎ যাতে লোম ছিড়ে যাবার ভয় না থাকে।
৮) রিং বেশি টাইট হলে কেটে ফেলা নিশ্চিত করতে হবে। আর খেয়াল রাখতে হবে যাতে কবুতর রিং বা ব্যান্ড লাগানো পা উঠিয়ে না রাখে। তাহলে বুঝতে হবে যে আপনার কবুতরের রিং বা ব্যান্ড এ সমস্যা হচ্ছে।

যাইহোক আশা করি ও মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে দুয়া করি যে, রিং বা ব্যান্ড নিয়ে যে তেলেসমাতি আমাদের দেশে চলছে বা চলে আসছে তা অচেরেই বন্ধ হবে, মানুষের সচেতনতা বাড়বে, রিং নিয়ে যে ভুল ধারনা আছে, তা কেটে যাবে। আর যে সব মানুষ এই সব নিয়ে ব্যাবসা করছে তাদের বোধগম্য হবে, মানুষ ঠকানর প্রবণতা বন্ধ হবে। (আমিন।)

মূল লেখক : সোহেল রাবি ভাই

নভেম্বর 16, 2013 3:45 অপরাহ্ন

8614 সর্বমোট দেখা হয়েছে, 0 আজকে